ডাইসন গোলক: সূর্যের শক্তি আহরণ করার অভাবনীয় চিন্তা

পদার্থবিদ্যার মতে, পৃথিবীতে শক্তির পরিমাণ সবসময় একই থাকবে। অর্থাৎ শক্তির কোনো সৃষ্টি কিংবা বিনাশ নেই, শুধু বদলায় এর রুপ। কিন্তু যদি শক্তি ধ্বংসই না করা যায়, তাহলে আমরা একে বাঁচানোর চিন্তা করি কেন?

একটি সাধারণ উদাহরণ দেয়া যাক। গাড়ি চালানোর জন্য প্রয়োজন জীবাশ্ম জ্বালানির। এই জ্বালানি রাসায়নিক শক্তিতে প্রথমে পরিণত হয়, এরপর যান্ত্রিক শক্তিতে এবং এর ফলে গাড়ি চলতে থাকে। এখানে শক্তির রুপান্তর ঘটলো, কিন্তু জ্বালানি কিন্তু খরচ হয়ে গেল। তো পুনরায় যদি আমরা সেই জ্বালানি পেতে চাইলে আমাদের যেতে হবে ভূ-অভ্যন্তরে, যেখানে লাখ লাখ বছরের উচ্চ চাপে তৈরি হয় জীবাশ্ম জ্বালানি। আসল কথা হচ্ছে, আমরা যত দ্রুত শক্তির ব্যয় বা রুপান্তর করতে পারবো, তত দ্রুত শক্তিকে পুনরায় তার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে পারবো না। সেই সামর্থ্য আমাদের নেই। এতকাল যাবত আমাদের পূর্বপুরুষদের শক্তি নবায়ন করা নিয়ে তেমন ভাবতেও হয়নি, কিন্তু আমাদের ভাবতে হচ্ছে এবং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও ভাবতে হবে। এজন্য শক্তি বাঁচানো ও সাশ্রয়, নবায়নযোগ্য শক্তিসহ নানাবিধ চিন্তাধারার উদ্ভব হচ্ছে। কিন্তু আজ এমন এক চিন্তা নিয়ে কথা হবে যা হচ্ছে জ্যোতির্বিদদের স্বপ্ন।

ডাইসন গোলক কী?
সহজ ভাষায় ডাইসন গোলক হচ্ছে এমন একটি গঠন বা স্থাপনা যার সাহায্যে আমরা সূর্য বা কোনো নক্ষত্রের শক্তি আহরণ করতে পারবো। ফ্রিম্যান ডাইসন প্রথম এই চিন্তাধারা উপস্থাপন করেন। ১৯৩৭ সালের উপন্যাস স্টার মেকার পড়ে তার মাথায় এই চিন্তা আসে। এরপর ১৯৬০ সালে একটি গবেষণাপত্রে তিনি এই গোলকের কথা তুলে ধরেন। তিনি সূর্যের চারপাশে কিংবা আশেপাশে এমন একটি গঠন তৈরির কথা বলেছিলেন যা দিয়ে সূর্যের শক্তি আহরণ করে সেটি পৃথিবীতে ফেরত পাঠানো যাবে।

যদি মানবজাতি কখনও এমন কিছু তৈরি করতে পারে এবং সূর্যের শক্তির খুব সামান্য পরিমাণ শক্তিও যদি আহরণ করা যায় তাহলে মানবসভ্যতাকে অন্য কোনো শক্তির উপর নির্ভর করতে হবে না। সূর্য এমন একটি অগ্নিকুন্ড যা বর্তমানে আমাদের সবচেয়ে সাশ্রয়ী পারমাণবিক চুল্লির চেয়ে প্রায় ১০০ কুইনটিলিয়ন (১ এর পাশে ২০টি শূন্য) গুণ শক্তিশালী এবং প্রতি সেকেন্ডে এতে এক ট্রিলিয়ন পারমাণবিক বোমার পরিমাণ শক্তি উৎপন্ন হচ্ছে। শুধু সামান্য নয়, এই শক্তির পুরোটাই যদি আমরা পেতে চাই তাহলে সূর্যের চারদিকে আমাদের তৈরি করতে হবে ডাইসনের গোলক। কিন্তু সূর্যের কাছেই যখন যাওয়ার প্রশ্ন ওঠে না, তখন তার চারপাশে এত বড় জিনিস কীভাবে তৈরি করা হবে?

যেভাবে তৈরি করা হবে ডাইসনের গোলক: প্রথমে যে চিন্তা মাথায় আসে সেটি হলো সূর্যের চারদিকে একটি কঠিন প্রাচীর তৈরি করা। কিন্তু এই ধারণা কাজ করবে না। কারণ বাইরে থেকে কোনো কিছুর সংঘর্ষে প্রাচীর ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে, এছাড়া সূর্যের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার সম্ভাবনা এতে রয়েছে এবং একপর্যায়ে পুরো স্থাপনাটি সূর্যে পতিত হতে পারে। আরেকটি টেকসই উপায় হচ্ছে সূর্যের চারপাশে সোলার প্যানেলের মতো একধরনের প্যানেল স্থাপন করা, যেগুলো সূর্যকে প্রতিনিয়ত প্রদক্ষিণ করবে। এই ধারণাকে বলে ডাইসন সোয়ার্ম (Swarm)।

এই ব্যবস্থার মাধ্যমে আমরা অসীম শক্তি পেতে পারি, কিন্তু এমন কিছু তৈরি করাও তেমন সহজ কাজ হবে না। সূর্য পৃথিবীর চেয়ে ১৩ লক্ষ গুণ বড়, তো প্রথমেই যদি আমরা স্যটেলাইটের কথা চিন্তা করি এবং প্রতিটি স্যাটেলাইট যদি ১ বর্গ কিলোমিটার সমান হয় তাহলে সূর্যকে ঘিরতে আমাদের প্রয়োজন হবে ৩০ কোয়াড্রিলন (৩০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০) স্যাটেলাইটের। যদি আমরা এতগুলো স্যাটেলাইট তৈরির চিন্তাও করি তাহলে আমাদের প্রয়োজন হবে প্রায় ১০০ কুইন্টিলিয়ন পরিমাণ উপাদানের। এবং এরপর আমাদের এই স্যাটেলাইটগুলো সূর্যের আশেপাশে স্থাপন করার জন্য আরও বিপুল পরিমাণ শক্তির প্রয়োজন হবে। শুধু তা-ই নয়, এগুলো স্থাপনের জন্যও আমাদের মহাশূন্যে আরও একটি অবকাঠামো তৈরি করতে হবে। অর্থাৎ একটি ডাইসন গোলক তৈরি করতে আমাদের উপকরণ, নকশা ও শক্তি এই তিনটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে।

প্রথম যে জিনিসটি আমাদের প্রয়োজন তা হচ্ছে উপকরণ বা কাঁচামাল। এই বিপুল পরিমাণ কাঁচামাল সংগ্রহ করতে আমাদের পুরো একটি গ্রহকেই ভেঙে ফেলার প্রয়োজন হতে পারে। আমাদের গ্রহসমূহের মাঝে সবচেয়ে উত্তম প্রার্থী হচ্ছে বুধ। এটি সূর্যের সবচেয়ে কাছে এবং বিভিন্ন প্রকারের ধাতুতে সমৃদ্ধশালী। সূর্যের সবচেয়ে কাছে হওয়ায় গোলক তৈরিতে কম পথ অতিক্রম করতে হবে এবং যেহেতু বুধের কোনো বায়ুমন্ডল নেই ও অভিকর্ষ পৃথিবীর এক-তৃতীয়াংশ, তাই মহাকাশে কোনো বস্তু প্রেরণ করা অনেক সহজ হবে।

এরপর আমাদের ভাবতে হবে গোলকের ডিজাইন কেমন হবে। প্যানেলগুলো তৈরি করতে হবে এমন উপকরণ দিয়ে যেগুলো সহজলভ্য এবং টেকসই। এছাড়া যত হালকা তৈরি করা যাবে স্থাপন করার জন্য তত সুবিধা হবে, কিন্তু ততটাও হালকা নয় যে সংঘর্ষে ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

সর্বশেষ আমাদের এগুলো তৈরি এবং মহাশূন্যে প্রেরণ করার জন্য শক্তির প্রয়োজন। এই শক্তির পরিমাণ এতটাই বৃহৎ যে যদি আমরা পৃথিবীর সকল জীবাশ্ম জ্বালানি এবং ইউরেনিয়াম ব্যবহার করি তাহলে শুধু মাউন্ট এভারেস্টের সমপরিমাণ ভর মহাকাশে প্রেরণ করতে পারবো। আসলে ব্যাপারটা এমন যে ডাইসন গোলক তৈরিতে আমাদের আরেকটি ডাইসন গোলকের থেকে প্রাপ্ত শক্তি প্রয়োজন।

আবার বুধের কথা বিবেচনা করা যাক, এজন্য আমাদের বুধে একটি বেজ বা স্টেশন তৈরি করতে হবে। যেহেতু বুধে মানুষের বাস করা কঠিন, তাই আমাদের যতটা সম্ভব অটোমেশনের দিকে ঝুঁকতে হবে। প্রধানত চার ধরনের প্রযুক্তি আমাদের প্রয়োজন হবে। এগুলো হলো প্যানেল বা সূর্যের শক্তি সংগ্রাহক, খনন, পরিশোধিতকরণ ও মহাকাশে প্রেরণের সরঞ্জাম।

প্রথমে এই সোলার প্যানেল দিয়ে প্রয়োজনীয় শক্তি সংগ্রহ করতে হবে। অতঃপর এই শক্তির সাহায্যে খনন ও পরিশোধন করে যে মৌল ও কাঁচামাল পাওয়া যাবে তা দিয়ে গোলকের জন্য প্যানেল তৈরি করতে হবে। প্যানেলগুলো সূর্যের চারদিকে প্রেরণের কাজটি সবচেয়ে দক্ষতার সাথে করতে হবে। এক্ষেত্রে রকেটের বিকল্প ভাবতে হবে, কারণ প্রচুর ব্যয়বহুল ও পুনরায় ব্যবহার করতে ঝামেলা পোহাতে হয়। একটি থিওরিতে একপ্রকার বন্দুকের (অনেকটা বাটুলের মতো) কথা বলা রয়েছে, যেগুলোর সাহায্যে ভূমি থেকেই খুব দ্রুতগতিতে এই প্যানেলগুলোকে মহাশূন্যে প্রেরণ করা যাবে। রকেট ক্যাপসুলের মতো প্রতিটি প্যানেলের আকার হবে এবং মহাকাশে প্রেরণের পর সেগুলো তাদের আকার বর্ধিত করবে।

এভাবে যখন আমরা কয়েকটি প্যানেল স্থাপন করতে হবে তখন গোলক থেকে আমাদের শক্তি আহরণ শুরু হবে এবং এই শক্তির সাহায্যে পূর্বের থেকে দ্রত আরও প্যানেল তৈরি ও স্থাপন করা সম্ভব। এভাবে যত প্যানেল বাড়বে তত প্যানেল তৈরি ও প্রেরণের কাজ দ্রুতগতিতে এগোবে। যদি সব ঠিকমতো এগোয় তাহলে ১০ বছরের মধ্যেই একটি ডাইসন গোলক তৈরি করা সম্ভব।

সূর্যের শুধু এক শতাংশ শক্তি পেলেই আমরা আমাদের পৃথিবীর সকল শক্তির চাহিদা মিটিয়ে অন্যান্য গ্রহে কিংবা মহাশূন্যে আরও স্টেশন তৈরি করতে পারবো। অন্যান্য গ্রহ থেকে শক্তি ও মূল্যবান ধাতু আহরণ, দ্রুতগতির মহাযানসহ আরও সব রোমাঞ্চকর প্রকল্প তৈরি করা যাবে। আমরা পরিণত হবো মহাজগতের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রাণীতে।

শুধুমাত্র পদার্থবিজ্ঞানের উপর ভিত্তি করে ডাইসন গোলক করা সম্ভব এবং তুলনামূলক সহজ কাজই বলা যায়। কিন্তু এর জন্য যে বিপুল পরিমাণ অর্থ প্রয়োজন তা জোগান দেয়া আমাদের পৃথিবীতে আপাতত অসম্ভব। অনেক বিজ্ঞানীই মনে করেন আমাদের মিল্কিওয়ে ছায়াপথে ডাইসন গোলকের অস্তিত্ব রয়েছে। ২০১৮ সালে মহাকাশে বিজ্ঞানীরা এমনই একটি নক্ষত্রকে লক্ষ্য করেন যা সেসময় সাড়া ফেলে দেয়। এই নক্ষত্রের নাম KIC 8462852, এছাড়া Tabby’s Star নামেও একে ডাকা হয়। এটি খুবই কম আলো দিত, মাঝে মধ্যে মাত্র ১ শতাংশ পরিমাণ। এমনও লাগতো যেন কেউ এর থেকে আলো শোষণ করছে। যদি আসলেই এমন হয়ে থাকে, তাহলে কে করলো এমনটা? তাহলে কি এলিয়েনের অস্তিত্ব রয়েছে? এটি আপাতত প্রমাণ না করা গেলেও ডাইসন গোলক তৈরি করা কিন্তু অসম্ভব নয়। যদি ভবিষ্যতের মানব প্রজন্ম ডাইসন গোলক তৈরি করতে সক্ষম হয়, তাহলে তখন সেটি অবাক করার মতো কিছু হবে না।

About Mukshedul Hasan Obak

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *