শীতে শুষ্ক ত্বকের যত্নে ১২টি ভুল, সমাধানে ঘরোয়া টিপস ও সতর্কতা

আপনার ত্বক কি প্রকৃতিগতভাবেই শুষ্ক? আপনার বয়স কি তিরিশ পেরিয়েছে? আপনি কি দিনের মধ্যে বেশিরভাগ সময়টাই শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কামরায় কাটান? তা হলে কিন্তু আগামী কয়েকটা মাস আপনাকে একটু বাড়তি সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে, না হলে ত্বকের শুষ্কতা খুব ভোগাবে৷ মনে রাখবেন, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আপনার ত্বক ক্রমশ আর্দ্রতা হারাবে, তাই বিশেষ যত্নআত্তি না পেলেই দেখা দেবে বলিরেখা৷ বয়সের আগেই ত্বকে ভাঁজ পড়বে, তা কুঁচকে যেতেও পারে৷ আশার কথা হচ্ছে, সামান্য একটু সচেতন হলেই কিন্তু এই সমস্যার হাত থেকে নিজেকে বাঁচানো সম্ভব৷

১। শুষ্ক ত্বকের হাত থেকে বাঁচতে পর্যাপ্ত পানিপান করুন:

শরীর ভিতর থেকে আর্দ্র না হলে তার ছাপ পড়বে ত্বকের উপর৷ তাই পর্যাপ্ত পরিমাণে পানিপান করুন৷ দিনে অন্ততপক্ষে আট-দশ গ্লাস পানিপান করা একান্ত আবশ্যক৷ ডাবের পানি, ফলের রসও পান করতে পারেন৷

২। অলিভ অয়েল:

অলিভ অয়েল সাধারণত সব ধরনের ত্বকের পক্ষেই খুব কার্যকর৷ এর মধ্যে উপস্থিত ফ্যাটি অ্যাসিড ও অ্যান্টিঅক্সিডান্ট শুধু আপনার মুখ নয়, পুরো শরীরের ত্বকের যত্ন নেয়৷ গোসলের আধ ঘণ্টা আগে মুখে ও পুরো শরীরে অলিভ অয়েল মেখে নিন৷ তার পর হালকা গরমপানিতে গোসল করে লাগিয়ে নিন ময়েশ্চরাইজ়ার৷ অলিভ অয়েল, ব্রাউন সুগার, আর মধু এমন অনুপাতে মিশিয়ে নিন যেন ঘন ক্রিমের মতো একটি উপাদান তৈরি হয়, তারপর হালকা হাতে সর্বাঙ্গে মেখে নিন এই মিশ্রণটি৷ অল্প চাপ দিয়ে গোল গোল করে মালিশ করুন, এতে আপনার শরীরের সমস্ত মৃত কোষ উঠে যাবে৷ তার পর গোসল করে হালকা ময়েশ্চরাইজ়ার লাগিয়ে নিন।

৩। দুধ/ দই:

দুধ ও দইয়ের ল্যাকটিক অ্যাসিড শুষ্ক ত্বকের পক্ষে খুব ভালো, রুক্ষ, শুষ্ক, ফাটা ত্বকে অনেক সময়েই জ্বালা বা চুলকানির মতো সমস্যাও দেখা যায়৷ তেমন হলে এক লিটার ঠান্ডা দই বা দুধে নরম কাপড় বা তুলো ভিজিয়ে নিন সর্বাঙ্গে লাগান৷ অন্তত পাঁচ মিনিট এই প্রলেপটি ব্যবহার করুন৷ তাতে ত্বকের জ্বালাভাব দূর হবে৷ দই বা দুধে উপস্থিত ল্যাকটিক অ্যাসিডের প্রভাবে ঝলমলিয়ে উঠবে আপনার ত্বক৷ কাঁচা দুধের সঙ্গে মধু মিশিয়ে নিন৷ তার পর সেটি আপনার গোটা শরীরে লাগিয়ে নিন গোসলের আগে। দই দিয়েও এই লেপটি তৈরি করা যায়৷ প্রলেপটি শুকিয়ে গেলে ধুয়ে ফেলুন ও গোসল করে নিন৷

৪। অ্যালো ভেরা:

অ্যালো ভেরা এমনই একটি উদ্ভিদ, যা টবে লাগালে খুব সহজেই বেড়ে ওঠে৷ একটি অ্যালো ভেরা পাতা নিন, মাঝখান থেকে কেটে ফেলুন সেটিকে৷ শাঁসটা বের করে নিয়ে ত্বকে লাগিয়ে নিন৷ জ্বালাভাব, চুলকানি মুহূর্তে কমে যাবে৷ সেরে যায় ছোটখাটো ইনফেকশনও৷ আর্দ্রতা জোগানোর পাশাপাশি এই শাঁস বা জেলের পরত আপনার ত্বকের উপর তৈরি করে রাখে সুরক্ষার আবরণ, তাতে দূষণ আপনার ত্বকে কোনও ছাপ ফেলতে পারে না৷

৫। নারকেল তেল:

মুখ ও শরীরের ত্বকের পাশাপাশি গোড়ালি, হাঁটু, কনুইয়েরও বিশেষ খেয়াল রাখা প্রয়োজন, বিশেষ করে শীতকালে৷ না হলে এগুলো রুক্ষ ও কালো হয়ে যায়৷ প্রথমে এই অংশের ত্বক ভিজিয়ে নিন পানি দিয়ে তারপর ত্বক যখন কুঁচকে যাবে, তখন বুঝবেন ত্বকে যথেষ্ট আর্দ্রতা পেয়েছে৷ নারকেল তেল সাধারণত শীতকালে জমে যায়৷ জমা তেলের মোটা পরত লাগিয়ে নিন আর্দ্র ত্বকে৷ তার পর মোজা বা লম্বা হাতা টপ বা পাজামা পরে ঘুমোতে যান৷ টানা বেশ কয়েকদিন করলে নিজেই পার্থক্যটা বুঝতে পারবেন।

৬। ওটমিল:

হাজার বছর ধরে ত্বকের পরিচর্যায় ব্যবহৃত হচ্ছে ওটমিল৷ সবচেয়ে ভালো কাজে দেবে ইনস্ট্যান্ট ওট, সেটাকে ব্লেন্ডারে দিয়ে প্রথমে পাউডারের মতো গুঁড়ো করে নিন৷ তার পর গোসলের বাথটবের পানিতে এক কাপ এই পাউডার দিয়ে ভালো করে মিশিয়ে দিন হাত দিয়ে৷ দেখে নেবেন যেন নিচের দিকে দলা পাকিয়ে না থাকে৷ তার পর এই পানিতে ১৫-২০ মিনিট শুয়ে থাকুন৷ ওটমিল ত্বক পরিষ্কার করে, আর্দ্রতা জোগায়৷ এর মধ্যে উপস্থিত অ্যান্টিঅক্সিডান্ট বজায় রাখে উজ্জ্বলতা৷

৭। কমলালেবু:

কমলালেবুতে উপস্থিত ভিটামিন সি ঠেকিয়ে রাখে বলিরেখা৷ কমলালেবুর খোসা, সরবাটা, ময়দা বা বেসনের প্রলেপের ব্যবহার রূপটান হিসেবে বহুদিন প্রচলিত৷ এই শীতে যত কমলালেবু খাবেন, তার খোসা ফেলবেন না৷ সব রোদে শুকনো করে রেখে দিন৷ পরে গুঁড়ো করে ব্যবহার করতে পারবেন।

৮। মেয়োনিজ়:

শুনতে একটু অদ্ভুত লাগলেও মেয়োনিজ় কিন্তু ত্বকের আর্দ্রতা ফিরিয়ে আনতে দারুণ কার্যকর৷ তবে মেয়োনিজ়ে সাধারণত লবন, গোলমরিচ, মাস্টার্ড পাউডার ইত্যাদি যোগ করা হয় স্বাদ বাড়ানোর জন্য৷ এই জিনিসগুলি যোগ করার আগে খানিকটা তুলে রেখে দিন মাস্ক হিসেবে ব্যবহারের জন্য৷ তা না হলে ত্বকে প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে৷ ডিমের কুসুম আর তেল ব্লেন্ড করে যে মেয়োনিজ় তৈরি হয়, তার সঙ্গে খানিকটা বেবি অয়েল মিশিয়ে নিন৷ তার পর মুখে, ঘাড়ে, কনুইয়ে, হাতে লাগিয়ে নিন গোসলের আগে৷ ডিমের গন্ধটা একটু কড়া, সেটা সহ্য করে নিতে পারলে এই প্যাকের কোনও জবাব নেই!

৯। মধু ও পাকা কলা:

পাকা কলা ও মধু একসঙ্গে ব্লেন্ড করে নিন৷ মুখে লাগান প্রলেপের মতো করে, তার পর ২০-২৫ মিনিট রেখে ধুয়ে ফেলুন ও ময়েশ্চরাইজ়ার লাগান৷ এটি নিয়মিত ব্যবহারের ফলে ত্বক পাবে প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা, হয়ে উঠবে নরম ও কোমল৷ পাকা কলা, মধু আর সরের প্রলেপও শুষ্ক ত্বকের খুব ভালো ওষুধ হতে পারে৷ মধু অন্য নানা প্যাকের সঙ্গেও নিশ্চিন্তে ব্যবহার করতে পারেন৷

১০। আমন্ড তেল:

আমন্ড তেলে প্রচুর ভিটামিন ই থাকে এবং তা আপনার ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়ায় ও ত্বককে করে তোলে মসৃণ৷ ত্বক খুব সহজেই এই তেল শুষে নেয়, কিন্তু চটচটানি অনুভূত হয় না৷ অ্যালো ভেরা জেলের সঙ্গে কয়েক ফোঁটা আমন্ড তেল আর মধু মিশিয়ে প্যাক তৈরি করে নিন৷ মুখে লাগিয়ে ১৫-২০ মিনিট অপেক্ষা করে সামান্য গরম পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন৷

১১। অ্যাভোকাডো:

অ্যাভোকাডোতে উপস্থিত প্রাকৃতিক তেল ত্বকের শুষ্কতা দূর করে এবং তা নরম ও কোমল হয়ে ওঠে৷ সেই সঙ্গে যদি খানিকটা মধু মিশিয়ে প্যাক তৈরি করেন, তা হলে আরও ভালো ফল পাবেন৷

১২। চকোলেট:

চকোলেটে উপস্থিত ক্যাফেইন থেকে ত্বকে আসে উজ্জ্বলতা৷ সেই সঙ্গে চকোলেটের ফ্যাটও ময়েশ্চরাইজ়ার হিসেবে ভালোই কাজ করে৷ ডার্ক চকোলেট গলিয়ে নিন মাইক্রোওয়েভ আভেনে৷ হালকা গরম থাকতে থাকতে তার সঙ্গে মধু মিশিয়ে ফেস প্যাক বানিয়ে নিন৷ মুখে, গলায়, ঘাড়ে, হাতে তা লাগিয়ে ১৫ মিনিট অপেক্ষা করুন৷ চোখের নিচ আর ঠোঁটের আশপাশের অংশে যেন প্যাক না লাগে সেদিকে নজর রাখবেন৷ তার পর সার্কুলার মোশনে হাত ঘুরিয়ে ম্যাসাজ নিন মুখে, সামান্য গরম পানি দিয়ে ধুয়ে ময়েশ্চরাইজ়ার লাগান৷

সতর্কতা​:

অতিরিক্ত গরম পানি দিয়ে বেশিক্ষণ ধরে গোসল করবেন না, তাতে ত্বকের আর্দ্রতা ক্রমশ হারাতে থাকে৷
গোসলের আগে অয়েল মাসাজ করলেও গোসলের পর অবশ্যই ময়েশ্চরাইজ়ার ব্যবহার করুন৷ তা না হলে শুষ্ক ত্বকের সমস্যা কোনওদিন কমবে না৷ ত্বক অল্প ভিজে থাকা অবস্থাতেই ময়েশ্চরাইজ়ার লাগিয়ে নিন৷
খুব কড়া সাবান আপনার ত্বকের শুষ্কতা কেড়ে নেবে৷ হালকা কোনও সাবান বা সোপ ফ্রি ক্লেনজ়ার ব্যবহার করুন৷ বেসন, মুসুর ডাল বাটা, চালের গুঁড়ো ইত্যাদি দিয়ে ত্বক খুব ভালোভাবে পরিষ্কার করা যায়৷ ক্লেনজ়ার বা স্ক্রাবার ব্যবহারের ক্ষেত্রেও এই সতর্কতা মেনে চলা উচিত৷

অ্যালকোহলযুক্ত টোনার বা যে কোনও স্কিনকেয়ার প্রডাক্ট এড়িয়ে চলুন৷ এগুলি ব্যবহারে ত্বকের আর্দ্রতার ভাঁড়ারে টান পড়ে৷
মিনারেল অয়েল, কৃত্রিম রং বা সুগন্ধিযুক্ত প্রডাক্ট ব্যবহার থেকে বিরত থাকুন৷
অহেতুক রোদ লাগাবেন না ত্বকে, বিশেষ করে সকাল ন’টার পর৷ সানস্ক্রিন ব্যবহার করুন৷ ছাতা, টুপি, সানগ্লাসও রোদের হাত থেকে আপনাকে বাঁচাবে৷
পরিবর্তন আনুন খাদ্যতালিকায়৷ ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড, ভিটামিন সি, আর ম্যাগনেশিয়াম যেন থাকে খাদ্যতালিকায়৷ তা না হলেই মুষড়ে পড়বে আপনার ত্বক৷ মাছ, আখরোট, ফ্ল্যাক্সসিড বা তিসি, ফল, শাকসবজি রাখুন রোজের খাদ্যতালিকায়৷ খুব তেলমশলাদার বা ভাজাভুজিজাতীয় খাবার এড়িয়ে চলুন৷

About Mukshedul Hasan Obak

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *