মহানবী (সা.)-এর অর্থনৈতিক সংস্কার

মুহাম্মদ (সা.) নবুয়তপ্রাপ্তির পর প্রথমে নিজ মাতৃভূমি মক্কার মানুষকে এক আল্লাহর পথে আহ্বান করেন। মক্কাবাসী তাঁর আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে তাঁর বিরুদ্ধে সদলবলে নির্মম অত্যাচার শুরু করে। অত্যাচারের দাবানলে জ্বলে-পুড়েও তিনি দাওয়াতের কাজ অব্যাহত রাখেন। পরে আল্লাহর আদেশে তখনকার ইয়াসরিব বর্তমান মদিনা শহরে হিজরত করেন।

মদিনায় গিয়ে অর্থনীতির ওপর গুরুত্ব দিলেন বিশেষভাবে। মানুষকে বেঁচে থাকতে হলে এবং একটা সমাজ, রাষ্ট্রকে পৃথিবীর পাড়া-মহল্লায় বুক উঁচু করে দাঁড়াতে হলে অর্থনীতির পাঁজর শক্ত হতে হবে। একটা রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব ও সমৃদ্ধির বুনিয়াদ নির্ভর করে অর্থনীতির ওপর।

বিশ্ববাসীর কল্যাণ ও বেঁচে থাকার কথা চিন্তা করে মানবতার নবী মুহাম্মদ (সা.) অর্থনীতিতে দিলেন এক যুগান্তকারী কর্মসূচি। সে কর্মসূচির আলোকে পরবর্তী সময়ে মদিনা শহর অর্থনীতিতে বুকটান দিয়ে পৃথিবীতে সগৌরবে দাঁড়িয়েছে। এখানে রাসুল (সা.)-এর দেওয়া কর্মসূচি হলো—

১. উপার্জনে হালাল ও হারাম নির্ধারণ : ইসলামী বিধান মতে ব্যাবহারিক জীবনে কিছু কাজকে হালাল এবং কিছু কাজকে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। উৎপাদন, ভোগ ও বণ্টনের ক্ষেত্রেও এ বিধান প্রযোজ্য। ইসলাম মানুষকে উপার্জনের প্রতি উৎসাহিত করেছে। পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছে উপার্জন অর্জনে। ব্যক্তি পছন্দমতো উৎপাদন, উপার্জন, ভোগ ও বণ্টন করবে। রিজিক অন্বেষণ করবে। বেঁচে থাকার জগতে জীবন চালানোর দায়ে প্রয়োজনে উপার্জনে ব্রত হবে। কিন্তু হারাম পন্থায় তিল পরিমাণ উপার্জন করা যাবে না। ইসলাম কখনো হারাম পন্থাকে সমর্থন করে না। পৃথিবীর অন্য সব ইজমভিত্তিক অর্থনৈতিক মতবাদে হালাল-হারামের পার্থক্য নেই। মানুষের জীবন বিপন্ন ও ক্ষতির দিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। তাদের অর্থনীতি স্বাবলম্বী হওয়াই প্রধান লক্ষ্য ও স্বপ্ন। তবে সভ্য মানুষের ধর্ম ইসলামে আছে নীতি, আদর্শ ও বিধি-বিধান। হালাল পন্থায় উপার্জনকে ইবাদত এবং হারাম পন্থাকে নিষিদ্ধ বা গুনাহের কাজ বলেছে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং উত্তম পন্থায় জীবিকা অন্বেষণ করো। যা হালাল তা-ই গ্রহণ করো এবং যা হারাম তা বর্জন করো।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২১৪৪)

২. সুদ উচ্ছেদ : শুদ্ধ, পবিত্র ও সৃজনশীল সমাজ গঠনের বড় অন্তরায় হলো সুদ। রাসুল (সা.) যখন দেখলেন সমাজে সুদের মহামারি এবং গণমানুষ সুদের কবলে পড়ে পাঁজর ভেঙে নেতিয়ে পড়েছে, তিনি তখন সমাজে সুদমুক্তির স্লোগান দেন। পবিত্র কোরআনে ঘোষণা হয়েছে, ‘আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৭৫)

রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা সুদ খায়, সুদ দেয়, সুদের হিসাব লেখে এবং সুদের সাক্ষ্য দেয় তারা সবাই সমান পাপী।’ (তিরমিজি, হাদিস : ১২০৬)

৩. ব্যাবসায়িক অসাধুতা উচ্ছেদ : মদিনার প্রায় সব মানুষের কাজকর্মে ব্যবসা-বাণিজ্যে তিনি প্রত্যক্ষ করলেন ব্যাবসায়িক অসাধুতা বিরাজমান। ইসলামী অর্থনীতিতে সর্বপ্রকার ব্যাবসায়িক অসাধুতা নিন্দনীয় ও কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ব্যাবসায়িক অসাধুতা শুধু কালোবাজারি, চোরাকারবারি নয়; মজুতদারি, ওজনে কম দেওয়া, ভেজাল, নকল প্রভৃতি জঘন্য অপরাধ। ইসলামের সোনালি যুগের অর্থব্যবস্থায় কঠোর হাতে দমন করা হয়েছে মানবতাবিবর্জিত অসাধুতা। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা মাপে ঠিক দাও এবং কারো ক্ষতি কোরো না, সঠিক দাঁড়িপাল্লায় ঠিকমতো ওজন করো। লোকদের পরিমাপে কম বা নিকৃষ্ট কিংবা দোষযুক্ত জিনিস দিয়ো না এবং দুনিয়াতে অশান্তি সৃষ্টি করে বেড়িয়ো না।’ (সুরা : শুআরা, আয়াত : ৮১-৮৩)

মজুতদারি প্রসঙ্গে রাসুল (সা.) বলেন, ‘কেবল পাপী ব্যক্তিই মজুদদারি করে।’ (সহিহ মুসলিম, আয়াত : ১৬০৫)

৪. জাকাত ব্যবস্থার প্রবর্তন : জাকাত ইসলামের রুকন। পাঁচ স্তম্ভের একটি। কোরআনে নামাজ কায়েমের পর জাকাত আদায়ের আদেশ করা হয়েছে। রাসুল (সা.)-এর আদেশে সম্পদশালী সাহাবি কেরাম (রা.) জাকাত আদায়ে প্রতিযোগিতা করতেন। জাকাতের মাধ্যমে সমাজে সাম্য-সৌহার্দ সৃষ্টি হয়। মানুষের মাঝে ভেদাভেদ কমে আসে। গরিবের মুখে হাসি ফোটে। এতিমের উদরে আহার প্রবেশ করে। জাকাত আদায়ে সমাজের কাঠামো, মানুষের জীবন যাপন সুখকর হয়। মানুষের অর্থনীতিতে গতিবেগ সঞ্চারিত হয়। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা নামাজ কায়েম করো এবং জাকাত দাও।’ (সুরা : হজ, আয়াত : ৭৮)

৫. বায়তুল মাল প্রতিষ্ঠা : বিভিন্ন উৎস হতে অর্জিত এবং রাষ্ট্রের কোষাগারে জমাকৃত ধন-সম্পদকেই বায়তুল মাল বলে। ইসলামী রাষ্ট্রের সব ব্যক্তির এতে সম্মিলিত মালিকানা রয়েছে। রাসুল (সা.) মদিনায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর বায়তুল মাল প্রতিষ্ঠা করেন। বায়তুল মালে সঞ্চিত ধন-সম্পদের ওপর সবার সাধারণ অধিকার স্বীকৃত করেন। রাষ্ট্রের কোনো নাগরিক যেন মৌলিক মানবিক প্রয়োজনীয় চাহিদা হতে বঞ্চিত না হয়, সে জন্য তিনি বায়তুল মাল গড়েন। গরিব, এতিম, দুস্থ ও অসহায় মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য এ প্রয়াস ও উদ্যোগ। পৃথিবীর অবহেলিত বঞ্চিত মানুষের জন্য নবীজির এ অভূতপূর্ব কর্মসূচি। ইসলামের আগে মানবতার কল্যাণে এমন ব্যবস্থা কেউ প্রণয়ন করেনি।

৬. মানবিক শ্রমনীতির প্রবর্তন : বিশ্বের ইতিহাসে মানবতার বন্ধু মুহাম্মদ (সা.) সর্বপ্রথম শ্রমনীতির প্রবর্তন করেন। শ্রমিকের বেতন-ভাতা, কষ্ট ও ঘামের মূল্য দিতে উৎসাহিত করেন। পৃথিবীর ইতিহাসে তাদের সম্মান, তাদের বেঁচে থাকা, তাদের মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটান। মুহাম্মদ (সা.) বলেন, ‘শ্রমিকের ঘাম শুকাবার আগেই তার মজুরি পরিশোধ করো।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ)

৭. উত্তরাধিকার নীতি প্রণয়ন : রাসুল (সা.)-এর আবির্ভাবের পূর্বে পৃথিবীতে ভূমির উত্তরাধিকারের আইন ছিল অস্বাভাবিক। পুরুষানুক্রমে পরিবারের জ্যেষ্ঠ সন্তানই সব সম্পদ পেত। অন্যরা হতো বঞ্চিত। অথবা পরিবারের শুধু ছেলেরা সম্পদের অধিকারী হতো, কিন্তু নারীরা পেত না সম্পদের কিছুই। রাসুল (সা.) নারীর অর্থনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন। কোরআনে ঘোষিত হয়েছে, ‘মাতা-পিতা ও আত্মীয়-স্বজনের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে পুরুষের অংশ আছে এবং মাতা-পিতা ও আত্মীয়-স্বজনের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে নারীদের অংশ আছে; অল্প হোক কিংবা বেশি। এ অংশ নির্ধারিত।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৭)

৮. রাষ্ট্রের ন্যায়সংগত হস্তক্ষেপের বিধান : সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠা ইসলামের বড় লক্ষ্য। সমাজের জুলুম, অত্যাচার, দুর্নীতি, অর্থনীতিতে শোষণ, শাসন, সুদ, ঘুষ, মুনাফাখোরি, মজুতদারি বন্ধ করতে রাসুল (সা.) ন্যায়সংগত হস্তক্ষেপের বিধান আরোপ করেন। এতে রাষ্ট্র ও তার অর্থনীতির বাক পরিবর্তন হয়। সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরে আসে। তিনি সমাজের মানুষের জন্য কায়েম করেন সামাজিক নীতি ও নিরাপত্তাব্যবস্থা। জনকল্যাণে রাখেন সর্বাধিক জোরালো ভূমিকা।

মদিনা ও পৃথিবীর অর্থনীতির চাকাকে সচল, সবল ও সুষ্ঠু সমৃদ্ধি রাখার জন্য রাসুল (সা.)-এর প্রদত্ত কর্মসূচি অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূলমন্ত্র। তাঁর দেওয়া কর্মসূচি পালন করতে পারলে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব।

About Mukshedul Hasan Obak

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *