Breaking News

গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজে নতুন আশা

পেঁয়াজ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে তিন বছরের রোডম্যাপ করেছে সরকার। আগামী ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে পেঁয়াজের চাহিদা পূরণ করা হবে। উৎপাদন বাড়াতে সমন্বিতভাবে কাজ করবে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি), বাংলাদেশ পরমাণু গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা), বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। চাষিদের সম্পৃক্ত করে রোডম্যাপ বাস্তবায়ন করা হবে। গত বৃহস্পতিবার কৃষি মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এই রোডম্যাপ চূড়ান্ত করা হয়। সংশ্নিষ্ট সূত্রে এ খবর জানা গেছে।

পেঁয়াজের ঘাটতি মেটাতে গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ চাষের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। কৃষকদের পেঁয়াজের উন্নত বীজ, উপকরণ, প্রযুক্তিসহ সব ধরনের সহযোগিতার ঘোষণা দিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক। রোডম্যাপ অনুসারে পেঁয়াজের আবাদে প্রায় তিন লাখ হেক্টর জমি প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে গ্রীষ্ফ্মকালীন পেঁয়াজেই জেগেছে নতুন আশা।

চাহিদা ও লক্ষ্যমাত্রা : কৃষি অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে পেঁয়াজের চাহিদা রয়েছে ৩০ লাখ টনের মতো। ২০২০ সালে বাংলাদেশে পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে ২৫ লাখ ৫৭ হাজার টন। তবে এ উৎপাদন থেকে গড়ে ২৫-৩০ শতাংশ নষ্ট হয়ে যায়। ফলে দেশে মোট পেঁয়াজের উৎপাদন গিয়ে দাঁড়ায় ১৫ থেকে ১৯ লাখ টনে। দেশের বাকি চাহিদা পূরণ করতে প্রায় ১১ লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি করতে হয়।

দেশে ঘাটতি মেটাতে পাশের দেশ ভারতের ওপরই নির্ভর করতে হয়। কারণ, এই দেশ থেকে কম দামে সহজে আমদানি করা সম্ভব হয়। কিন্তু গত বছরের মতো গত সেপ্টেম্বরেও বাংলাদেশে পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দেয় ভারত। এরপর পেঁয়াজের দাম বেড়ে কমবেশি ১০০ টাকা হয়। গত বছর ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করার পর দেশের বাজারে দাম উঠেছিল ২৫০-৩০০ টাকা কেজি।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের মতে, পেঁয়াজ উৎপাদনে ঘাটতির মূল কারণ হলো- ফলন কম হয়। উৎপাদনে জমির স্বল্পতা রয়েছে। মানসম্মত বীজের অভাব প্রকট। আবহাওয়া সমস্যাতো আছেই। সংরক্ষণাগারের অভাবে পেঁয়াজ পচে যায়। এছাড়া প্রয়োজনীয় শ্রমিক সংকটও বড় বাধা। এসব কারণে পেঁয়াজে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারছে না দেশ।

রোডম্যাপে চলতি মৌসুমে উচ্চ ফলনশীল পেঁয়াজ উৎপাদনে ১০টি জেলাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। যেখানে সরাসরি অন্য ফসলের সঙ্গে উন্নত জাতের পেঁয়াজের চাষ হবে। ক্রমান্বয়ে সব জেলায় পেঁয়াজ চাষের জমি বাড়িয়ে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা হবে। এলাকাভেদে উপযোগী উন্নত জাতের বীজ ও প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে চাষ সম্প্রসারণ, শস্যবিন্যাস ও সম্ভাব্য জমির পরিমাণ ঠিক করা হয়েছে।

কৃষি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশে প্রতি বছর প্রায় ১১শ টন পেঁয়াজের বীজের দরকার হয়। সরকারিভাবে ৫ থেকে ৬ টন, বেসরকারিভাবে ৫০ থেকে ৬০ টন বীজ উৎপাদিত হয়। বাকি বীজ কৃষকরা উৎপাদন করেন, যা পুরোপুরি মানসম্মত নয়। নতুন পরিকল্পনায় পেঁয়াজের বীজের পরিমাণ ও উৎপাদন সম্ভাব্যতা ধরা হয়েছে চলতি ২০২০-২১ মৌসুমে ৯৪২ টন, ২০২১-২২ মৌসুমে এক হাজার ৩০ টন ও ২০২২-২৩ মৌসুমে এক হাজার ৮৮ টন।

কৃষি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শুধু গ্রীষ্ফ্মকালীন বারি পেঁয়াজ-৫ ও শীতকালীন বারি পেঁয়াজ-৪ ও ৬ জাত চাষের মাধ্যমে ২০২০-২১ থেকে ২০২০-২৩ অর্থবছর পর্যন্ত ২ লাখ ৩৭ হাজার ৬১৯ হেক্টর জমিতে ২৯ লাখ ৬১ হাজার টন পেঁয়াজ উৎপাদন সম্ভব। এতে মোট চাহিদার ৮৩ দশমিক ৪০ শতাংশ পূরণ হবে। কর্ম পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, উচ্চ ফলনশীল জাত এবং উন্নত পদ্ধতিতে চাষাবাদ করে ১৫-২০ শতাংশ উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। এতে ২০২২-২৩ সালে ৩৬ লাখ টন পেঁয়াজ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা রয়েছে।

আশা জাগাচ্ছে গ্রীষ্ফ্মকালীন পেঁয়াজ : কৃষকদের আশার আলো দেখাচ্ছে গ্রীষ্ফ্মকালীন পেঁয়াজ বারি-৫। গবেষকদের দাবি, শুধু বাম্পার ফলন নয়, বারো মাসই চাষ করা সম্ভব নতুন জাতের এই পেঁয়াজ। সংশ্নিষ্টরা বলছেন, এই জাতটির বীজ কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে পারলে আমদানি নির্ভরতা কেটে যাবে। প্রাথমিকভাবে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) উদ্যোগে মেহেরপুরে ১০১ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের গ্রীষ্ফ্মকালীন জাতের চাষে সফলতা পেয়েছেন চাষিরা।

কৃষি সচিব মেসবাহুল ইসলাম বলেন, আগামী তিন বছরে দেশে পেঁয়াজের উৎপাদন ১০ লাখ টন বাড়ানো হবে। সে জন্য গ্রীষ্ফ্মকালীন পেঁয়াজ উৎপাদন বাড়াতে হবে। কৃষি মন্ত্রণালয় এ লক্ষ্য অর্জনে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা নিয়েছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব হাসানুজ্জামান কল্লোল সমকালকে এ বিষয়ে বলেন, গ্রীষ্ফ্মকালীন পেঁয়াজ চাষকে মেহেরপুর থেকে সারাদেশে ছড়িয়ে দিতে কৃষকদের প্রণোদনাসহ করণীয় নির্ধারণ করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়।

কৃষকদের দোরগোড়ায় গ্রীষ্ফ্মকালীন পেঁয়াজের বীজ পৌঁছাতে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. নাজিরুল ইসলাম। তিনি সমকালকে বলেন, সরকারের সহযোগী এনজিও এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সঙ্গে যেসব প্রতিষ্ঠান কিংবা উদ্যোক্তা আছেন তাদের মাধ্যমে আমরা বীজ সারাদেশে পৌঁছে দেব।

স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে কৌশল : গ্রীষ্ফ্ম, শীতকালীনসহ উচ্চ ফলনশীল পেঁয়াজের উৎপাদন বাড়ানো, বসতবাড়ির আঙিনায় চাষ, বাজার তদারকি, উৎপাদন মৌসুমে আমদানি নিয়ন্ত্রণ ও স্থিতিশীল বাজার মূল্য, কৃষকদের ভর্তুকি ও ঋণ সুবিধা সম্প্রসারণ, পরিমিত পরিমাণে সার ও সেচের ব্যবহার, গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানো, সংরক্ষণাগার ও উন্নত প্রযুক্তির বিষয়ে কৃষকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পেঁয়াজে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে চায় সরকার। দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে উৎপাদন মৌসুমে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ রাখার কথা বলা হয়েছে রোডম্যাপে। কৃষক মৌসুমে যেন উপযুক্ত দাম পান তার ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনে নূ্যনতম দাম নির্ধারণ করতে হবে। এ ছাড়া ৪ শতাংশ হারে ঋণ সুবিধার পরিধি বাড়ানো হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, আমরা পেঁয়াজে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার পথে এগোচ্ছি। পেঁয়াজের উৎপাদন কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বাড়ানোর জন্য এলাকা উপযোগী উন্নত জাত ও প্রযুক্তি বিস্তারের মাধ্যমে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে হবে। পাশাপাশি কৃষিকে লাভজনক করার অংশ হিসেবে ৩ বছর মেয়াদি রোডম্যাপ প্রণয়ন করা হয়েছে। রোডম্যাপ অনুযায়ী সব উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে এ সময়ের মধ্যে দেশে পেঁয়াজের উৎপাদন ১০ লাখ টন বাড়বে।

About Mukshedul Hasan Obak

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *