Breaking News

জলদস্যু বাবা দেখতে কেমন, প্রশ্ন শিশুপুত্রের

জলদস্যু বাবা দেখতে কেমন? তিনিও কি অন্য বাবাদের মতো? নাকি অন্য কিছু? অনেক কৌতূহল নিয়ে আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে এসেছিল ৮ বছরের শিশু রায়হান। আর সেখানে বাবা দেখে উৎফুল্লিত শিশু রায়হান। তার মতে, বাবা তো বাবা। জলদস্যু হলেও তিনি অন্যদের বাবার মতোই বাবা। জন্মের ৮ বছর পর গতকাল বৃহস্পতিবার প্রথম বাবাকে দেখে এমন অনুভূতি প্রকাশ করেছে রায়হান।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালের উপস্থিতিতে গতকাল বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে ১১টি বাহিনীর ৩৪ জলদস্যু অস্ত্রসহ আত্মসমর্পণ করেন। বিনাশর্তে হলেও স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার যে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার এরই ধারাবাহিকতায় নগরীর বাঁশখালী, মহেশখালী ও কুতুবদিয়া এলাকার ১১টি বাহিনীর ৩৪ জন জলদস্যু আত্মসমর্পণ করেন।

আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল ছাড়াও আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি সাংসদ শামসুল হক টুকু, স্থানীয় সাংসদরা, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব মোস্তফা কামাল উদ্দিন, পুলিশ মহাপরিদর্শক ড. বেনজীর আহমেদ ও র?্যাবের অতিরিক্ত পরিচালক তোফায়েল মোস্তফা সরোয়ার।

জলদস্যুদের পাশাপাশি আত্মসমর্পণকারী অনুষ্ঠানস্থল বাঁশখালী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আরো উপস্থিত ছিল তাদের পরিবার স্ত্রী-সন্তানরা। তাদেরই একজন ৮ বছরের শিশু রায়হান। জন্মের পর থেকে যে তার বাবা শাবউদ্দিনকে দেখেনি। তাই আজ বাবাকে দেখতে চট্টগ্রামের বাঁশখালী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে মা মোছা. জানু আরার সঙ্গে হাজির হয়।

শিশু রায়হান জানায়, ছোট বেলায় বাবাকে দেখিনি। বাবা দেখতে কেমন তাও জানতাম না। জন্মের পর থেকেই এ পর্যন্ত বাবা কখনো আমাকে দেখতেও আসেনি। শুধু মায়ের কাছে বাবার অনেক গল্প শুনেছি। আমি জানি, আমার বাবা খারাপ কোনো কাজ করেনি। এলাকার কিছু দুষ্টু মানুষ বাবাকে ফাঁসিয়ে বাড়ি ছাড়া করে।
আত্মসমর্পণ করতে যাওয়া মো. শাবউদ্দিনের স্ত্রী জানু আরা জানান, স্থানীয় একটি মারামারির ঘটনার পর তার স্বামীর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা হয়। মামলার পর তার স্বামী ভয়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে জলদস্যু বাহিনীতে যোগ দেয়। এরপর দীর্ঘ আট বছর সে বাড়ি আসেনি। তার সঙ্গে কোনো প্রকারের যোগাযোগও ছিল না। সে বেঁচে আছে কিনা তাও চার বছর আগে জানতেন না।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেন, উপকূলে কোনো জলদস্যু বা বনদস্যুর আস্তানা গড়তে দেয়া হবে না। আমাদের র‌্যাব, পুলিশ, কোস্টগার্ড ও বিজিবি রয়েছে। সবাই তৎপর রয়েছে। আপনারা পালিয়ে বেড়াতে পারবেন, কিন্তু আস্তানা গড়তে পারবেন না। যে যেখানে আছেন, তাদের খুঁজে বের করা হবে। তাই কঠোর পরিণতির আগে আত্মসমর্পণ করুন। যারা আত্মসমর্পণ করেছেন তাদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি। যারা আত্মসমর্পণ করেননি তারা ভাববেন না, আমাদের কিছু হবে না। আপনারা যা যা করছেন, সবই আমরা দেখছি। কোথাও পালিয়ে থাকতে পারবেন না।

তিনি বলেন, এক সময় উপকূলের লোকজন এসব জলদস্যুদের কাছে জিম্মি ছিল। ধার করে হলেও দস্যুদের দাবিকৃত টাকা পরিশোধ করত। জেলেদের নিয়ে আটকে রেখে মুক্তিপণ আদায় করা হতো। ২০১৬ সালের ৩১ মে সুন্দরবনের কুখ্যাত মাস্টার বাহিনী আত্মসমর্পণের মাধ্যমে দস্যুদের আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়া শুরু হয়। এখন পর্যন্ত বিভিন্ন উপকূলের ৩২৮ জন জলদস্যু আত্মসমর্পণ করেন। এখনই উপকূলকে দস্যুমুক্ত বলছি না, তবে সংখ্যা অনেক কমে এসেছে।
তিনি বলেন, সুন্দরবনের দস্যুদের আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য প্রাথমিকভাবে কিছু আর্থিক সহায়তা দেয়া হয়েছে। তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। আজো আত্মসমর্পণকারী দস্যুদের কিছু আর্থিক সহায়তা করা হবে। তারা আজ প্রতিজ্ঞা করে গেলেন এই অন্ধকার পথে আর যাবেন না, আলোকিত পথে আসবেন এবং দস্যুতা করবেন না।

আইজিপি ড. বেনজীর আহমেদ বলেন, শেখ হাসিনার বাংলদেশ, অর্থনৈতিক উন্নয়নের দেশ। এখানে কোনো চোর ডাকাত থাকতে পারে না। যারা আত্মসমর্পণং করেছেন তাদের সমাজের মূলধারায় ফিরে আসতে সহযোগিতা করতে হবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজবের বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, কিছু কুলাঙ্গার দেশবিরোধী, হাতে গোনা কয়েকজন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কুৎসা রটিয়ে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। আপনারা কেউ গুজবে কান দেবেন না। যে কোনো তথ্য যাচাইয়ে ৯৯৯ এ ফোন দিন, আমরা আপনাদের পাশে আছি।

আত্মসমর্পণ শেষে ডাকাত সর্দার আব্দুল হাকিম ওরফে বাইশ্যা ডাকাত বলেন, এ পথে আসার কারণে আমি ছাড়াও আমার সন্তানদের মানুষ ঘৃণা করত। ভালো হওয়ার সুযোগ পেয়েছি, তাই কাজে লাগালাম। এছাড়া প্রশাসনের ভয়ে কোথাও যেতে পারি না। এক সময় সব ভুল বুঝতে পেরে ভালো হওয়ার সুযোগ খুঁজি। র?্যাব সেই সুযোগ দিয়েছে। এরপরই আত্মসমর্পণ করি। ইনশাআল্লাহ, এখন থেকে স্বাভাবিকভাবে জীবনযাপন করতে পারব। আর খারাপ পথে যেতে চাই না। এখনো যারা আত্মসমর্পণ করেননি, তাদের দ্রুত আত্মসমর্পণ করার আহ্বান জানান তিনি।

অনুষ্ঠানে জলদস্যুদের হামলায় আহত ভুক্তভোগী নেছার মাঝি বলেন, জলদস্যুরা আমার ফিশিং ট্রলারে আক্রমণ করলে তাদের গুলিতে আমার বাম চোখ নষ্ট হয়ে যায়। এখনো শরীরের বিভিন্ন জায়গায় গুলির চিহ্ন বহন করছি। এই এলাকার জলদস্যু ও সন্ত্রাসীদের কারণে হাজার হাজার মানুষ নির্যাতিত হয়েছে। এমন উদ্যোগে খুব খুশি হয়েছি। তাই র?্যাবসহ সবাইকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল ও র‌্যাব-পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে ৯০টি অস্ত্র ও ২ হাজার ৫৬ রাউন্ড গুলি বুঝিয়ে দেন ৩৪ আত্মসমর্পণকারী। এর আগে ২০১৮ সালের ২০ অক্টোবর ৪৩ জন জলদস্যু র‌্যাবের মাধ্যমে আত্মসমর্পণ করেন। গত ২০১৬ সালের ৩১ মে থেকে ১ নভেম্ব^র, ২০১৮ পর্যন্ত সুন্দরবনের ৩২টি দস্যু বাহিনীর ৩২৮ জন সদস্য ৪৬২টি অস্ত্র ও বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদসহ আত্মসমর্পণ করেন। এখন তারা মাছের ঘের, কাঁকড়া চাষসহ নানা পেশায় নিয়োজিত আছেন। আবার কেউ অন্য কাজ করছেন। আত্মসমর্পণ পরবর্তী সময়ে পুনর্বাসনে সরকারের পক্ষ থেকে তাদের প্রত্যেককে নগদ এক লাখ টাকা ও আইনি সহায়তা দেয়া হয়। গতকাল আত্মসমর্পণকারী জলদস্যুরা হচ্ছেন- বাইশ্যা বাহিনীর আব্দুল হাকিম ওরফে বাইশ্যা ডাকাত (৫২), আহামদ উল্লাহ (৪২) ও আব্দুল গফুর ওরফে গফুর (৪৭)। ফুতুক বাহিনীর দিদারুল ইসলাম ওরফে পুতিক্যা (৩২), জসিম উদ্দিন (২৬) ও মিজানুর রহমান (২৩)। খলিল বাহিনীর আব্দুর রহিম (৬৪) ও মাহমুদ আলী প্রকাশ ভেট্টা।

বাদল বাহিনীর ওবায়দুল্লাহ (৩৬), রমিজ বাহিনীর ইউনুছ (৫৬), দিদার বাহিনীর তৌহিদ ইসলাম (৩৪), বাদশা বাহিনীর নিজাম উদ্দিন ভাণ্ডারি, ইউনুস (৫১), কামাল উদ্দিন (৪৭), কাদের বাহিনীর আব্দু শুক্কুর (২৮)। জিয়া বাহিনীর সাহাদাত হোসেন দোয়েল (৪১), পারভেজ (৩৩), নাছির বাহিনীর নাছির (৫১), আমির হোসেন (৪৮) ও সাকের (৪০)। কালাবদা বাহিনীর সেলিম বাদশা (৩৪), আব্দুল গফুর ওরফে গফুর, আবু বক্কর সিদ্দিক (৩১) ও মামুন মিয়া (২৭)। অন্য দস্যুবাহিনীর আবু বক্কর সিদ্দিক ওরফে বাইশ্যা (২৯), বেলাল মিয়া (৩০), আব্দুল হাকিম ওরফে বাক্কু (৩৫), রশিদ মিয়া (৩৬), ইসমাইল (২৪), সাহাবুদ্দিন ওরফে টুন্নু (৩২), ফেরদৌস (৫২), রেজাউল করিম (৪০), ইউনুচ (৪২) ও মন্জুর আলম (৪২)।

About Mukshedul Hasan Obak

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *