শুঁটকির পুষ্টি ও শুঁটকি গ্রহণে সতর্কতা

শুঁটকি মাছ— যেমন সুস্বাদু তেমন পুষ্টিকর। রুচিবর্ধকও। সাধারণত কাঁচা মাছে লবন মাখিয়ে কড়া রোদে শুকিয়ে শুঁটকি প্রস্তুত করা হয়। যে কারণে এই মাছে কোন জলীয় অংশ এবং জীবাণু থাকে না। শুঁটকিতে চর্বির পরিমাণ কম থাকে বা থাকে না বললেই চলে। ফলে অন্যান্য সমপরিমাণে কাঁচা মাছের চেয়ে শুঁটকিতে প্রোটিন, ভিটামিন ‘ডি’ এবং অন্যান্য খনিজ উপাদানের পরিমাণ অনেক বেশি থাকে। শুঁটকির গুণাগুণ নিয়ে বিস্তারিত লিখেছেন পুষ্টিবিদ আছিয়া পারভীন আলী শম্পা

শুঁটকির উপকারিতা—

● শুঁটকিতে প্রায় সব ধরনের অ্যামাইন এসিড ছাড়াও মানব দেহের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন খনিজ উপাদান যেমন- আয়রন, ফসফরাস, ক্যালসিয়াম, আয়োডিনও আছে প্রচুর পরিমাণে।

দেশে নানা প্রজাতির মাছের শুঁটকি পাওয় যায়। যেমন- পুঁটি, চাপিলা, কাঁচকি, চিংড়ি, বাইম, মলা, বইচ্যা, লইট্যা, ফাৎরা, ইলিশ, রূপচাঁদাসহ হরেক রকম মাছের শুঁটকি। শুঁটকির মধ্যে চিংড়ির শুঁটকিতে আয়রনের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি থাকে।

● অনেক মানুষ আছেন যারা প্রোটিন বা আমিষের অভাবজনিত নানা সমস্যাতে ভুগে থাকেন। তারা যদি নিয়মিত বিভিন্ন মাছের শুঁটকি গ্রহণ করে থাকেন তবে এই ঘাটতি খুব সহজেই পূরণ করা সম্ভব।

● অনেকেরই মধ্যে ধারণা রয়েছে- গরু বা খাসির গোশত শুধু শরীরের জন্য ভালো আর ভালো খাবার মানেই দামি খাবার হতে হবে, তাদের বলছি আমাদের চারপাশে এমন অনেক কম দামি খাবার আছে যা পুষ্টি গুণের দিক থেকে যে কোন দামি খাবার থেকে অধিকসমৃদ্ধ। শুঁটকি তেমনই একটি খাবার- সহজলভ্য কিন্তু পুষ্টি গুণের দিক থেকে বেশ উপকারি।

● শুঁটকিতে থাকা ভিটামিন ‘ডি’, ক্যালসিয়াম এবং ফসফরাস মানবদেহের হাড়, দাঁত এবং নখের গঠনের জন্য অপরিহার্য উপাদান। এই উপাদানগুলোর অভাব হলে হাড়ের গঠন দুর্বল হওয়া ছাড়াও দেহের অন্যান্য কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়। সুতরাং যারা হাড়ের বিভিন্ন সমস্যাতে ভুগছেন তারা খাদ্য তালিকায় রাখতে পারেন শুঁটকি।

● বাড়ন্ত শিশুদের প্রোটিনের চাহিদা মেটানোর জন্য শুঁটকি হতে পারে খুবই ভালো একটি উৎস। তবে শিশুদের জন্য শুঁটকি রান্নার ধরন হতে হবে আলাদা। বড়দের চাইতে ছোট শিশুদের প্রোটিনের চাহিদা প্রায় দ্বিগুণ থাকে। আর প্রোটিনের অভাব হলে শিশুর গ্রোথ বাধাগ্রস্ত হয়। এই বাড়তি চাহিদা পূরণে শিশুদের শুঁটকি দেয়া যেতে পারে।

● নিয়মিত শুঁটকি খেলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে। বিশেষ করে যারা নিয়মিত শুঁটকি খেয়ে অভ্যস্ত তাদের সহজে জ্বর, সর্দি হয় না।

● শুঁটকিতে আয়োডিনের মাত্রা বেশি থাকায় বিভিন্ন ধরনের হরমোনাল সমস্যা দূর করতে এবং দেহে রক্ত বাড়াতে সাহায্য করে।

কতটুকু খাবেন—

কোন বিশেষ ধরনের শারিরীক জটিলতা না থাকলে একজন মানুষ প্রতিদিন ৩০ গ্রাম পর্যন্ত শুঁটকি খেতে পারেন।

শুঁটকি গ্রহণে সতর্কতা—

● বর্তমানে বাণিজ্যিকভাবে শুঁটকি প্রস্তুত এবং সংরক্ষণ করার জন্য অনেক অসাধু ব্যবসায়ী আছেন যারা শুঁটকিতে ডিডিটি মেশান যা মোটেও স্বাস্থ্যসম্মত নয়। এই রাসায়নিক স্প্রে মিশ্রিত শুঁটকি গ্রহণ করলে লিভার ক্যান্সার, কিডনি ড্যামেজ, চর্ম রোগ, খোস-পাঁচড়া প্রভৃতি জটিল সমস্যা হতে পারে। তাই শুঁটকি খাবার আগে বা কেনার আগে ভালো ভাবে জেনে নিন। যদি সম্ভব হয় নিজেই ঘরে শুঁটকি বানাতে পারেন। বাজার থেকে শুঁটকি কিনে আনার পর গরম পানি দিয়ে বেশ কয়েকবার ধুয়ে নিন বিশেষ করে যতক্ষণ শুঁটকি থেকে গন্ধ না যায়।

যাদের উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা রয়েছে তারা শুঁটকি খাওয়া থেকে বিরত থাকবেন। কেননা শুঁটকি সংরক্ষণ এবং প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় প্রচুর লবণ দেয়া হয়।

● যাদের, বাতের সমস্যা এবং কিডনি রোগ আছে তারা শুঁটকি পরিহার করবেন।

যে উৎস থেকে শুঁটকি কেনা হয়েছে তা কেমিক্যালমুক্ত কিনা নিশ্চিত হতে না পারলে গর্ভবতী মায়েদের শুঁটকি পরিহার করা উচিত।

● শুঁটকি ভর্তা বা তরকারি দিয়ে যেভাবেই রান্না করুন না কেন তেল এবং মসলার পরিমাণ কম না থাকলে তা শরীরে উপকার করার চাইতে অপকার করবে। তাই শুঁটকির পুষ্টির গুণাগুণ বজায় রাখার জন্য যত কম তেলে রান্না করা যায় ততই মঙ্গল।

About Mukshedul Hasan Obak

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *