কাঠমিস্ত্রির জোগালদার থেকে বিসিএস ক্যাডার

বিড়ি শ্রমিক বাবার অভাবের সংসারে লেখাপড়া প্রথম বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল সপ্তম শ্রেণিতেই। শিক্ষকরা স্কুলে বিনাবেতনে পড়ার সুযোগ করে দিলেও খাতা-কলমসহ অন্যান্য খরচের অভাবে আবারও আটকে যায় তার পড়ালেখা। শেষ পর্যন্ত পড়ালেখার খরচ জোগাতে করেছেন কাঠমিস্ত্রির জোগালদারের কাজ। ব্যানার, ফেস্টুন লেখার কাজও করেছেন। কিন্তু দমিয়ে রাখা যায়নি কুড়িগ্রামের মো. শফিকুল ইসলামকে। শিক্ষকসহ বিভিন্ন মানুষের সহযোগিতায় পড়ালেখা শেষ করা

শফিকুল নিজ মেধার জোরে এখন বিসিএস ক্যাডার। ৩৫তম বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে উত্তীর্ণ হয়ে লালমনিরহাট সরকারি মজিদা খাতুন কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছেন তিনি। কুড়িগ্রাম শহরের পলাশবাড়ির চকিদার পাড়ায় বাড়ি শফিকুলের। বিসিএস ক্যাডার হিসেবে চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর শুক্রবার (৫ মে) শফিকুলের বাড়িতে গিয়ে দেখা হয় তার সঙ্গে। বাঁশের চাটাই আর পাটখড়ির বেড়ার জরাজীর্ণ ছোট দু’টি ঘরে জীবনযাপন শফিকুলের পরিবারের।

রান্নাঘরে তখন রান্নায় ব্যস্ত শফিকুলের মা মোছা. ছোবেনা বেগম, বাবা আব্দুল খালেক ছেলের সঙ্গে বসে গল্প করছেন। সন্তান বিসিএস ক্যাডার হওয়ার গৌরব তাদের চোখে-মুখে। বাবা আব্দুল খালেক বলেন, ‘বিভিন্ন সমস্যার কারণে ইংরেজি ও অঙ্কে খারাপ করছিল শফিকুল। টাকার অভাবে প্রাইভেট পড়াতে পারিনি ওকে। সংসারে আমার আরও চার ছেলে থাকলেও ওদের কারও সামর্থ্য ছিল না আর্থিক সহায়তা করার। পরে পাশের গ্রামের লাভলু নামের এক শিক্ষার্থী টাকা না নিয়েই প্রাইভেট পড়ায়

শফিকুলকে। ওর স্কুলের শিক্ষকরাও টাকা-পয়সা দিয়ে যথেষ্ট সহায়তা করেছে। স্কুলে ওর বেতন নেওয়া হতো না। এ কারণেই ও পড়ালেখা করতে পেরেছে। এভাবেই নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে ২০০৫ সালে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেন শফিকুল। তার পরীক্ষার ফল-ও হয় সবাইকে চমকে দেওয়ার মতো। মানবিক বিভাগ থেকে জেলায় একমাত্র শিক্ষার্থী হিসেবে জিপিএ-৫ পান শফিকুল। তার বাবা-মা জানান, পরীক্ষার পর সংসারের সমস্যা সামলাতে গিয়ে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে পারেননি শফিফুল।

কাঠমিস্ত্রির জোগালদারের কাজ শুরু করেন পরীক্ষার পরই। এই কাজের ফাঁকে ব্যনার, ফেস্টুন লেখাসহ নানা ধরনের আর্টের কাজ করে টাকা উপার্জন করেন তিনি। বেশি টাকা পাওয়া যায় বলে ট্রাকের হেলপারিও করেন শফিকুল। বাবা-মায়ের সঙ্গে শফিকুলশফিকুল ইসলামের এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে সঙ্গীতশিল্পী কনক চাঁপা তাকে আর্থিক সহায়তা দেন। এরপর ঢাকার ‘মুক্তি আর্ট’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান তাকে শিক্ষাবৃত্তি দেয়। এই টাকা দিয়েই শফিকুল

পার্বতীপুরের খোলাহাট ক্যান্টনমেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজে ভর্তি হন। উচ্চ মাধ্যমিকে উত্তীর্ণ হয়ে ২০০৭-২০০৮ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে। শফিকুল বলেন, ‘আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি হওয়া পর্যন্ত মুক্তি আর্ট পাশে ছিল। এছাড়া, আমার এলাকার অনেকেও বিভিন্ন সময় আমাকে সহায়তা করেছেন। বিশেষ করে কুড়িগ্রাম সরকারি স্কুলের শিক্ষক আব্দুল মান্নান স্যারের কথা বলতে হবে।’ শফিকুল জানান, বিসিএসে উত্তীর্ণ হয়ে গত ২ মে লালমনিরহাট সরকারি মজিদা খাতুন

কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে চাকরিতে যোগ দেন। শফিকুলের বাবা আব্দুল খালেক বলেন, ‘আমার ছেলে কষ্টের প্রতিদান পেয়েছে। অনেকের সাহায্য নিয়ে, নিজে অনেক কষ্ট করে এই জায়গায় এসে পৌঁছেছে শফিকুল। ওর এই সাফল্যে আমরা খুব খুশি।’ শফিকুল বলেন, ‘অভাবের জীবন আমি পদে পদে উপলব্ধি করেছি। আমার শিক্ষক আর কিছু মহানুভব মানুষের সহযোগিতায় আমি আজ এ পর্যন্ত আসতে সক্ষম হয়েছি। আমি সবার কাছে কৃতজ্ঞ।’ ভবিষ্যতের স্বপ্ন সম্পর্কে জানতে চাইলে

শফিকুল বলেন, ‘আমার প্রথম বেতনের টাকা দিয়ে বাবা-মায়ের থাকার ঘরটির মেরামতের কাজ করাবো। বাবা-মায়ের নামে একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠান চালুর স্বপ্ন আছে আমার। তবে সবকিছুর সঙ্গে সঙ্গে আমি অবশ্যই আমার মতো অভাবী শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষাবৃত্তির ব্যবস্থা করতে চাই। টাকা-পয়সার অভাবে কারও পড়ালেখা যেন থমকে না যায়, সেটা নিশ্চিত করতে চাই আমি।’ এছাড়া, নিজ এলাকায় একটি পাঠাগার ও বয়স্কদের জন্য শিক্ষার ব্যবস্থা করার ইচ্ছার কথাও জানান কাঠমিস্ত্রির জোগালদার থেকে বিসিএস ক্যাডার হওয়া শফিকুল।

About Mokaddes

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *